টু_ফাইভ_এইট_জিরো পর্ব:- ০৭

' আপনি কি মিতুর কলিগ ফয়সাল সাহেব? ' 


' ফয়সাল কে? আমি তো কোনো ফয়সালকে চিনি না গোয়েন্দা সাহেব। কিন্তু আপনাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। চিনতাম না তবে চিনে নিয়েছি। তাই ভালো করে বলছি যে পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দেন। আপনি উত্তরা থেকে চলে যান। ' 


' গাড়ি ভাড়া কি আপনি দিবেন? ' 


' কিসের গাড়ি ভাড়া? ' 


' এই যে আমাকে উত্তরা থেকে চলে যাবার জন্য পরামর্শ বা হুকুম দিচ্ছেন। তো উত্তরা থেকে তো হেঁটে হেঁটে যেতে পারবো না। ' 


সাজুর এমন রসিকতার কারণে অপরপ্রান্তে কথা বলার কণ্ঠ পরিবর্তন হয়ে গেল। মানে মোবাইল অন্য কেউ টেনে নিয়ে বলছে, 


' ওই গোয়েন্দার বাচ্চা? তোর অনুসন্ধান আমি তোর মুখে দিয়ে পিছন থেকে বের করে দেবো। বেশি পাকনামি না করে যা বলছি তাই কর। ' 


' ঠিক আছে ভাই চলে যাবো। ' 


' এইতো বুদ্ধিমানের কথা! '


' আমি চলে যাবো ঠিকই, কিন্তু সেটা আপনার সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলার পরে। ' 


' মানে? ' 


' মানে আমি আফরিনকে যারা হ!ত্যা করেছে তাদের যেভাবেই হোক খুঁজে বের করবো। আর আমার বিশ্বাস সেই দলের মধ্যে আপনিও খুব ভালোভাবে জড়িত আছেন। ' 


' চুপ কর শা!লার গোয়েন্দা। আমি আফরিনের খুনের ব্যাপারে কিছু জানি না। ' 


' তাহলে আপনার মাথা ব্যথার কারণটা জানতে পারি মাস্টার মশাই? ' 


' এখানে অনেক কাহিনী জড়িয়ে আছে। আমি চাই না সেগুলো বেরিয়ে আসুক। তোকে আবারও বলি তুই এসব থেকে দুরে থাক। ' 


' আপনি যদি খু!ন না করেন তাহলে আপনার মাথা ব্যথার একটা কারণ অবশ্য আছে। '


' মানে? ' 


' মানে হচ্ছে, আফরিনের মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে সে কোনো এক পুরুষের সঙ্গে সহবাস করেছে। আমার মনে হচ্ছে আপনি সেই ব্যক্তি। ' 


' শালা তোকে তো আমি......! '


কল কেটে গেল, সাজু আবারও কলব্যাক করলো কিন্তু নাম্বার বন্ধ। বড়ভাই হাসানকে নাম্বারটা মেসেজ করে পাঠিয়ে দিল। অটোকল রেকর্ড চালু করা থাকে সবসময়। সাজু ভাই বাড়িওয়ালার কাছে গিয়ে বললো,


' বিএফসি টা কোনদিকে? ' 


সিদ্দিক সরকার বললেন ' সেক্টর পার হয়ে ঢাকা গাজীপুর হাইওয়ের জসীমউদ্দিন মোড়ের কাছে। ' 


' আফরিন ওখানে কার সঙ্গে দেখা করতে যেতে চেয়েছিল? কে হতে পারে। ' 


' কথার ধরনে তো আপনজন কেউ মনে হচ্ছে। যেমন ধরুন...! "


' যেমন কি? বয়ফ্রেন্ড? '


' হতে পারে, আজকাল ছেলে মেয়েরা প্রেমের সম্পর্কে একটু বেশি জড়ায়। ' 


' আপনারা জড়াননি কখনো? ' 


' জ্বি, মানে! ' 


' বাদ দেন ঠাট্টা করলাম। তদন্ত করতে এসে যে সারাক্ষণ শুধু মুখ গম্ভীর করে থাকবো তেমনটা তো নয় তাই না? ' 


' তা ঠিক আছে। কিন্তু আপনি কার সঙ্গে কথা বললেন? কে আপনাকে উত্তরা থেকে চলে যেতে হুকুম দিচ্ছে? ' 


' সেটাই খুঁজে বের করতে হবে সরকার কাকা। ' 


' এখন কি তাজুলের কাছে থানায় যাবেন? ওকে জিজ্ঞেসা করবেন নাকি? ' 


' ভেবেছিলাম তো তাই করবো। কিন্তু দ্বিতীয় কল এসে একটু ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। আপাতত মিতুর অফিসে যেতে হবে আরেকবার। তারপর সেখান থেকে থানায় যাবো। ' 


' ঠিক আছে, আপনার তদন্তের কাজে আমাকে যখনই দরকার হবে জানাবেন। আপনাকে সর্বোচ্চ সাহায্য করার জন্য চেষ্টা করবো। আপনি আমার নাম্বারটা রাখুন। ' 


' ম্যালা ম্যালা ধন্যবাদ আপনাকে। আজকে আর হয়তো আসবো না। আগামীকাল সকালে আবার আসতে পারি। আপনার বাসার প্রতিটি ফ্ল্যাটে কিছু কথাবার্তা বলতে হবে। ' 


' কেন কেন? ' 


' বাচ্চাদের মতো কথা বলেন কেন? '


' কিন্তু তিন তলার খু!নের জন্য সম্পুর্ণ বাড়ির ভাড়াটিয়াদের জিজ্ঞেসাবাদ করলে কেমন দেখা যায় বলেন। তাদের কি দোষ? ' 


' আঙ্কেল একটা বিষয় ভাবুন। আপনার সামনেই সিসি ক্যামেরার ভিডিও চেক করলাম। সেখানে অপরিচিত কারো আগমন ঘটেনি। তারমানে তো খু!নি আপনার বিল্ডিংয়ের মধ্যে ছিল তাই না? ' 


' কি বলছেন এসব? ' 


সাজু দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো, 

' রফিক ভাই আপনি একটা কাজ করবেন। বাসায় কে কখন বের হয় আর প্রবেশ করে সেগুলো নজর রাখবেন। কারো আচরণে সন্দেহ হলেই আমাকে জানাবেন। কেউ যদি বাসা থেকে গ্রামের বাড়িতে বা ঢাকা ছেড়ে কোথাও যায় সেটাও কিন্তু জানাবেন। ' 


' সাজু স্যার, গতকাল রাতে তো একজন গ্রামের বাড়িতে যাবে বলে চলে গেছেন। ' 


' কে সে? ' 


' তামান্না ম্যাডাম। '


' সে কোথায় থাকতো? তিনতলায় তাজুল স্যারের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতো, 3A ' 


' সেখানে কে কে থাকতো? ' 


' ওনারা দুই বান্ধবী। ' 


' কতদিন ধরে ভাড়া আছে তারা? ' 


' তিনমাসের মতো হবে। ' 


' তারা কি পড়াশোনা করে নাকি কোথাও চাকরি করতো? ' 


সিদ্দিক সরকার বললো, ' দুজনেই চাকরি করতো বনানীতে। আমার এক বন্ধুর পরিচিত তাই এদের থাকতে দিয়েছিলাম। ' 


' তামান্না যদি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকে তাহলে তার বান্ধবী নিশ্চয়ই বাসায় আছে? ' 


' না নেই, সে অফিসের কাজে সিলেট গেছে। আজকে সন্ধ্যা বেলা আসার কথা। তামান্না ম্যাম গতকাল বলে গেছে। ' বললেন দারোয়ান। 


' ঠিক আছে আপনি আমার নাম্বারটা রাখুন। আমি মিতুর অফিস থেকে বের হয়ে থানায় গিয়ে সব কাজ শেষ করে রাতে আবার আসবো। ' 


' আচ্ছা ঠিক আছে। ' 


' যেহেতু তামান্নার বান্ধবী বাসায় ছিল না। গতকাল দুপুরে ঘটনার সময় কি তামান্না বাসায় ছিল? ' 


' হ্যাঁ বাসায় ছিল। ' 


বাড়ির মালিক সিদ্দিক সরকারের দিকে তাকিয়ে সাজু বললো ' আপনার কাছে নিশ্চয়ই তামান্না মেয়েটার নাম্বার আছে? ' 


' তা তো আছে ই। ' বললেন সিদ্দিক সরকার। 


' নাম্বারটা আমাকে দিন। ' 


নিতান্ত অনিচ্ছায় নাম্বারটা দিলেন তিনি। সাজু সেই নাম্বারে কল দিল পরপর দুবার কিন্তু কেউ রিসিভ করলো না। 


সাজু আর কিছু বললো না। আদনানকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে গেল। আদনান বাইক চালাচ্ছে। সাজু বিড়বিড় করে মুখ নাড়ছে। আফরিনের মোবাইল গতকাল পাওয়া যায়নি। খু!নি তার মোবাইল সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। 

কথা হচ্ছে তাজুলকে যদি কল রিসিভ না করে মেসেজ করা হয় তাহলে সেটা কে করেছে? আর কখন করেছে সেটাও দেখা দরকার। তাজুলের মোবাইল থানায় পুলিশের কাছে জমা আছে। সেখানে মেসেজ টাইম চেক করলেই হয়তো জানা যাবে। কিন্তু কে এই তামান্না? 


মিতুর অফিস উত্তরার ১৩ নাম্বার সেক্টরে। অফিসে গিয়ে সাজু সরাসরি ফয়সাল সাহেবের সাথে কথা বলতে গেলেন। ফয়সাল সাহেব সাজুকে দেখে একটুও খুশি হননি সেটা তার চেহারার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। 


সাজু বললো ' কাজের কি খুব চাপ নাকি? ' 


ফয়সাল সাহেব মুখের অন্ধকার বজায় রেখে বললেন ' কোম্পানির চাকরিতে সারাজীবনই চাপ বেশি থাকে। এটা নতুন কিছু নয়। ' 


' তবুও আজ একটু বেশি হবার কথা। যেহেতু মিতু ম্যাডাম নেই তাই দুজনের কাজ একার পক্ষে শেষ করতে হচ্ছে। ' 


' তা ঠিক বলেছেন। যাইহোক আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন? ' 


' মিতুর ছোটবোন হ!ত্যার বিষয় কিছু জিজ্ঞেস করতে এসেছি। ' 


' সকাল বেলা তো একগাদা প্রশ্ন করে গেলেন। খু!ন হয়েছে বাসায় সেখানে তদন্ত করেন। অফিসে তো খু!ন হয়নি যে বারবার অফিসে আসবেন। দিনের মধ্যে চৌদ্দবার অফিসে এলে কেমন দেখা যায় বলেন তো? '


' আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন? নাকি কোনকিছু গোপন করার জন্য আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন? ' 


' বিরক্ত হচ্ছি এটা ঠিক কথা। কিন্তু এই হ!ত্যার বিষয় আমি তেমন কিছু জানি না যে লুকানোর চেষ্টা করবো। ' 


' আপনি কি সকাল থেকে অফিসের মধ্যেই ছিলেন নাকি বাহিরে গেছিলেন? ' 


' লাঞ্চ করতে গেছিলাম। ' 


' কখন গিয়েছেন আর কখন ফিরেছেন? ' 


' আপনারা আসার কিছুক্ষণ আগেই এসেছি। ' 


সাজু নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফয়সাল সাহেবকে বললেন, 


' কয়টা বাজে দেখুন তো? '


ফয়সাল সাহেব টেবিলের উপর রাখা তার নিজের মোবাইল দেখে বললেন ' তিনটা পঁচিশ! '


' তাহলে তো আমার আর আপনার ঘড়ির টাইম ঠিকই আছে। ' 


' তো কি হয়েছে? ' 


' গতকাল ম্যাডাম মিতুর সঙ্গে সাড়ে বারোটার দিকে লাঞ্চ করতে গেলেন। আর দুইটার দিকে ফিরলেন। কিন্তু আজ তিনটা পর্যন্ত বাহিরে কি করছেন? যেহেতু আপনার অফিসে কাজের চাপ বেশি তাই এতক্ষণ তো বাহিরে থাকার কথা নয়। ' 


' সকাল থেকে শরীরটা ভালো ছিল না। তাই ঠিক সময়ে লাঞ্চ করিনি। তাছাড়া কিছু কাজ ছিল সেগুলো শেষ করে দুটোর দিকে বের হয়েছি। ' 


' আর বাহিরে গিয়ে আমার কাছে কল দিয়ে এই উত্তরা থেকে চলে যেতে হুকুম করেছেন, তাই তো ফয়সাল সাহেব? ' 


' আশ্চর্য, আমি কেন আপনাকে উত্তরা থেকে চলে যেতে বলবো? উত্তরা কি আমার বাবার সম্পত্তি? ' 


' দেখুন ফয়সাল সাহেব, আমি একটা বিষয় কিন্তু বুঝতে পারছি না। আপনি শুধু শুধু রাগ কেন করছেন? আপনার তো সকাল থেকে শরীর অসুস্থ তার উপর আবার রাগ করেন কেন? ' 


' আপনি কি আমার সঙ্গে ফাজলামো করেন? ' 


' ছি ছি তা কেন করবো? এসির মধ্যে বসেও আপনার কপাল নাক ঘেমে জবজবে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আপনার শরীর সত্যিই ভালো নেই। ' 


' একটা কথা বলি আপনাকে? ' 


' অবশ্যই বলুন। ' 


' মিতু ম্যাডামের বোন যখন খু!ন হয়েছে তখন কিন্তু আমি অফিসেই ছিলাম। সুতরাং আমার কাছে এসে বারবার নিজের সময় নষ্ট করবেন না প্লিজ। কারণ আমি কিছু জানি না। ' 


সাজুর পকেটে মোবাইল কাপছে। মোবাইল বের করে দেখলো বাড়িওয়ালার কাছ থেকে আনা তামান্নার সেই নাম্বারে দিয়ে কল এসেছে। সাজু সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করলো, 


মেয়েটা বললো, 

' আসসালামু আলাইকুম। '


' ওয়া আলাইকুমুস সালাম, আমি কি তামান্নার সঙ্গে কথা বলছি? ' 


' হ্যাঁ আমি তামান্না বলছি। কিন্তু আপনি? ' 


' আমাকে আপনি চিনবেন না। ঢাকায় আপনি যে বাসায় থাকেন সেই বাসার আপনার পাশের ফ্ল্যাটে গতকাল একটা মেয়ে খু!ন হয়েছে। আশা এই ঘটনা আপনার অজানা নয়। ' 


' হ্যাঁ জানি আমি। আফরিন ও মিতু আপুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। আমি প্রায়ই তাদের বাসায় যাওয়া আসা করতাম। ' 


' গতকাল আফরিন খু!ন হয়েছে সাড়ে বারোটা থেকে দুইটার মধ্যে। আর দারোয়ান রফিকের কাছে শুনলাম আপনি তখন বাসায় ছিলেন। ' 


' হ্যাঁ বাসায় ছিলাম, কারণ রাতে আমার গ্রামের বাড়িতে রওনা দেবার কথা ছিল। তাছাড়া আমি ছুটি নিয়েছিলাম আগের দিনই। ' 


' তাহলে গতকাল আফরিন বাসায় গিয়ে আপনার সঙ্গে কি দেখা হয়েছে তার? ' 


' না হয়নি, আমি জানতাম না আফরিন বাসায় এসেছে। তাছাড়া মাত্র দুদিন আগেই সে এসেছিল। গতকাল কখন এসেছে আমি জানি না। বিকেলে সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ বাসায় আসে। ' 


' আফরিনের পারসোনাল কোনো বিষয় আপনার জানা আছে কি? ' 


' আফরিন আমাদের বাড়িওয়ালার ছেলের সঙ্গে রিলেশনে ছিল। সম্ভবত ওর বোন মিতু আপু সেটা জানতেন। ' 


' কি বললেন? ' 


' জ্বি ঠিকই বলছি। মিতু আপু যে অফিসে চাকরি করে সেই অফিসের ফয়সাল সাহেব আমাদের বাড়িওয়ালার ছেলের বন্ধু। বাড়িওয়ালার ছেলের রেফারেন্সেই মিতু আপুর চাকরি হয়েছে। ' 


[ কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। সকলকে মন্তব্য করার আমন্ত্রণ রইল। ভালোবাসা অবিরাম। ]

.

সকাল ছয়টা বাজে ঘুম থেকে উঠে আন্টিকে নিয়ে ঢাকা পিজি হাসপাতালে গেলাম। হাসপাতাল থেকে উত্তরা বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকাল পাঁচটা। তারপর আবার মেসের জন্য বাজার করতে গেলাম। বাজার করে ফিরে তারপর লেখা শুরু করেছিলাম। সবার আগ্রহ ও ভালোবাসা ছিল বলেই কষ্ট করে লিখলাম। নাহলে এতো পরিশ্রমের পরে একটা লম্বা ঘুম দিতাম। কিন্তু হাজার হাজার পাঠক পাঠিকাকে অপেক্ষা করিয়ে তাদের ঘুম কেড়ে নিয়ে আমি কীভাবে ঘুমাই বলেন তো! 

.

.

.

.

চলবে..... 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ